টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল আর অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকাগুলোতে বোরো ধানের মৌসুম এবার বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার—প্রায় সব হাওরেই একই চিত্র: পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান, আর যে ধান কাটা হয়েছে সেটিও রোদ না থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেনের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট। ধার-দেনা করে চাষ করা জমির ধান পুরোপুরি পানিতে ডুবে যাওয়ায় তিনি এখন ঋণ শোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায়। শুধু তিনি নন, পুরো অঞ্চলজুড়ে হাজারো কৃষকের একই অবস্থা।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে প্রতিদিনই নতুন নতুন জমি প্লাবিত হচ্ছে। কিশোরগঞ্জে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার একর জমি পানির নিচে চলে গেছে।
নেত্রকোনায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর। কংস ও উব্দাখালী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। একইসঙ্গে সোমেশ্বরীসহ অন্যান্য নদীর পানিও বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
যেসব কৃষক আগেভাগে ধান কেটে ফেলেছিলেন, তারাও এখন বিপাকে। রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না, ফলে মাঠে বা বাড়ির আঙিনায় রাখা ধান পচে যাচ্ছে।
কৃষকরা বলছেন, একদিনের রোদ পেলেই ধান অনেকটা রক্ষা করা যেত। কিন্তু টানা মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির কারণে সেই সুযোগ মিলছে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে হাওর এলাকায় বন্যার পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে এবং নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
হাওর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা মূলত এক ফসলের ওপর নির্ভরশীল—বোরো ধান। বছরে একবারই এই ফসল ঘরে তোলার সুযোগ পান কৃষকরা।
সাধারণত ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ধান কাটার মৌসুম হলেও এবছর এপ্রিলের শুরু থেকেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় সময়মতো ফসল কাটতে পারেননি অধিকাংশ কৃষক।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বাঁধগুলো আপাতত নিরাপদ রয়েছে। তবে কোথাও কোথাও পানি নামানোর জন্য নিয়ন্ত্রিতভাবে বাঁধ কেটে দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিলেও বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ অনেক ক্ষেত ইতোমধ্যেই পানির নিচে চলে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টি ও বন্যার ধরণ বদলে যাচ্ছে, যা হাওর অঞ্চলের কৃষিকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। আগাম বন্যা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে ফসলহানির শঙ্কা—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে হাওরের কৃষকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সময়ের আগে বন্যা ও টানা বৃষ্টি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে শুধু একটি মৌসুম নয়, পুরো বছরের খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর এর বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।